কবুতর ডিম না দেওয়ার কারণ ও সমাধান (Pigeon Not Laying Eggs)
কবুতর পালন আমাদের দেশে এখন শুধু শখ নয়, বরং অনেকের জন্য একটি লাভজনক ব্যবসা। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, সঠিক নিয়মে জোড়া দেওয়ার পরও মাদি কবুতর ডিম দিচ্ছে না। নতুন ও অভিজ্ঞ উভয় খামারিই এই কবুতর ডিম না দেওয়ার কারণ ও সমাধান নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েন।
সাধারণত কবুতরের বয়স, পুষ্টির অভাব, ভুল জোড়া বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে এই সমস্যা (Pigeon Not Laying Eggs) হয়ে থাকে। আজকের এই ব্লগে আমরা জানবো কেন কবুতর ডিম পাড়ে না এবং এর প্র্যাকটিক্যাল সমাধান কী।
এক নজরে মূল বিষয়: কবুতর ডিম না পাড়ার পেছনে মূলত ৩টি কারণ থাকে:
১. ক্যালসিয়ামের অভাব
২. অপ্রাপ্ত বয়স
৩. ভুল জেন্ডার সিলেকশন
অধিকাংশ সময় খাঁচায় গ্রিট (Grit) বা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করলে এবং কবুতরকে মানসিক চাপমুক্ত রাখলে ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
Table of Contents:
- কবুতর ডিম দেওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম ও লক্ষণসমূহ
- কবুতর ডিম না দেওয়ার প্রধান ৫টি কারণ
- ১. কবুতরের বয়স কম হওয়া বা ব্রিডিং ম্যাচিউরিটি (Breeding Age)
- ২. নর ও মাদি কবুতরের সঠিক জোড়া না লাগা (Pair Bonding)
- ৩. অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস (Stress Factors in Pigeons)
- ৪. অনুপযুক্ত খাঁচা বা ডিম পাড়ার জায়গার অভাব (Inadequate Nesting Place)
- ৫. ঋতু পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার প্রভাব (Seasonal Changes & Molting)
- পুষ্টির অভাব এবং এর সমাধান (Nutritional Deficiency & Solutions)
- কবুতরের সুষম ব্রিডিং খাবার ও পুষ্টির তালিকা
- Expert Breeder's Advice
- ন্যাচারাল উপায়ে কবুতরের ডিম পাড়ার ক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল
- প্রয়োজনীয় ঔষধ ও সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের সঠিক নিয়ম
- সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
- শেষ কথা (Final Words)
কবুতর ডিম দেওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম ও লক্ষণসমূহ
একটি সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মাদি কবুতর জোড়া নেওয়ার পর সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ডিম দিয়ে থাকে। ডিম দেওয়ার এই স্বাভাবিক চক্রটি বোঝার জন্য কবুতরের কিছু শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা জরুরি।
যখন একটি মাদি কবুতর ডিম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়, তখন সে খাঁচায় বা লফটের কোণায় খড়কুটো জমিয়ে বাসা (Nesting) তৈরি করতে শুরু করে। একে আমরা সাধারণত “ডিম্বাশয় সক্রিয় হওয়া” বা কবুতর “ডিম্ব খড় গোছানো” বলে থাকি।
এই সময়ে নর কবুতরটি মাদি কবুতরকে তাড়া করে এবং মাদি কবুতরের পেছনে পেছনে ঘোরে, যাকে খামারিদের ভাষায় “ড্রাইভিং (Driving)” বলা হয়।
ডিম দেওয়ার ২-৩ দিন আগে মাদি কবুতরের মলদ্বার বা ভেন্ট (Vent) অংশটি কিছুটা ফুলে যায় এবং ঝুলে পড়ে। কবুতর তখন বেশি সময় ডিমের পাত্রে বা খাঁচার কোণায় বসে থাকে।
যদি আপনার কবুতরের মধ্যে এই লক্ষণগুলো থাকার পরও ডিম না আসে, তবে বুঝতে হবে ভেতরে কোনো সমস্যা রয়েছে।
কবুতর ডিম না দেওয়ার প্রধান ৫টি কারণ
- কবুতরের বয়স কম হওয়া
- সঠিক জোড়া না লাগা
- মানসিক চাপ
- অনুপযুক্ত খাঁচা
- আবহাওয়ার প্রভাব
১. কবুতরের বয়স কম হওয়া বা ব্রিডিং ম্যাচিউরিটি (Breeding Age)
নতুন কবুতর খামারিদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো কম বয়সী বা অপরিপক্ব কবুতরকে জোড়া দেওয়া। কবুতর দেখতে বড় হলেই সে ডিম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।
জাতভেদে বয়স নির্ধারণ: গিরিবাজ, রেসার বা সাধারণ দেশি কবুতর সাধারণত ৬ থেকে ৭ মাস বয়সে ডিম দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। অন্যদিকে, ফেন্সি বা বিদেশি বড় জাতের কবুতর (যেমন: কিং, জ্যাকোবিন, লাহোরি) ডিম দেওয়ার পূর্ণ ম্যাচিউরিটি পেতে ৯ থেকে ১০ মাস সময় নেয়।
সমস্যা: যদি আপনি ৫ বা ৬ মাসের একটি ফেন্সি মাদি কবুতরকে জোড়া দেন, তবে তার রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেম বা ডিম্বাশয় পুরোপুরি তৈরি না হওয়ার কারণে সে ডিম দেবে না।
ভবিষ্যৎ ক্ষতি: জোর করে কম বয়সে জোড়া দিলে মাদি কবুতরের হাড় দুর্বল হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সে স্থায়ীভাবে ডিম দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে (Egg Binding বা ডিম আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে)।
সমাধান: কবুতরের ডান পাখার পশম (Feathers) গণনা করুন। কবুতরের ১০ম পর বা পাখা পুরোপুরি গজানোর পর আরও অন্তত ১ মাস অপেক্ষা করে তারপর জোড়া দিন।
২. নর ও মাদি কবুতরের সঠিক জোড়া না লাগা (Pair Bonding)
আপনার কবুতর ডিম না দেওয়ার আরেকটি অন্যতম বড় কারণ হতে পারে তাদের সঠিক জোড়া বা পেয়ারিং না হওয়া। অনেক সময় আমরা মনে করি দুটো কবুতর একসাথে থাকলেই তারা জোড়া বেঁধেছে, কিন্তু বাস্তবে তা নাও হতে পারে।
ভুল জেন্ডার সিলেকশন (দুটোই মাদি বা দুটোই নর): কবুতরের লিঙ্গ বা জেন্ডার নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। অনেক সময় ভুলে খাঁচায় দুটোই মাদি কবুতর একসাথে রাখা হয়। এক্ষেত্রে তারা একে অপরের সাথে জোড়া নিয়ে নেয় এবং ডিমও দেয়। কিন্তু সেই ডিম ফুটে কখনো বাচ্চা হয় না (Unfertilized Eggs)। আবার দুটো নর কবুতর একসাথে দিলে তারা মারামারি করবে এবং কখনো ডিম আসবে না।
জোরপূর্বক জোড়া দেওয়া: নর এবং মাদি কবুতর একে অপরকে পছন্দ না করলে জোড়া সফল হয় না। তারা শুধু খাঁচায় পাশাপাশি বসে থাকে কিন্তু ব্রিডিং বা ক্রস (Mating) করে না। ক্রস না করলে মাদি কবুতরের ডিম্বাণু সক্রিয় হয় না।
সমাধান: নিশ্চিত হোন যে আপনার জোড়াটি পারফেক্ট। নর কবুতরটি ডাকছে কি না (Cooing) এবং মাদি কবুতরটি মাথা নিচু করে তার ডাক গ্রহণ করছে কি না তা লক্ষ্য করুন। সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ কোনো খামারিকে দিয়ে জেন্ডার বা লিঙ্গ পরীক্ষা করিয়ে নিন।
৩. অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস (Stress Factors in Pigeons)
কবুতর অত্যন্ত সংবেদনশীল পাখি। এদের প্রজনন ক্ষমতা বা ডিম উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে হরমোনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কবুতর যদি কোনো কারণে মানসিক চাপে বা ভয়ে থাকে, তবে তার শরীর থেকে স্ট্রেস হরমোন (Cortisol) নিঃসৃত হয়, যা ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
শিকারী প্রাণীর ভয়: খাঁচার আশেপাশে যদি নিয়মিত বিড়াল, কুকুর, ইঁদুর, বেজি, চিল বা কাকের আনাগোনা থাকে, তবে মাদি কবুতর সবসময় আতঙ্কে থাকে। এই তীব্র ভয়ের কারণে তারা ডিম দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
খাঁচা বা লফটের জায়গা পরিবর্তন: অনেক খামারি বারবার কবুতরের খাঁচা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরান বা নতুন লফটে নিয়ে যান। কবুতর নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সময় নেয়। যতক্ষণ না তারা নতুন পরিবেশকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করছে, ততক্ষণ মাদি কবুতর ডিম পাড়বে না।
অতিরিক্ত কোলাহল ও মানুষের যাতায়াত: লফটের আশেপাশে যদি সারাক্ষণ অতিরিক্ত চিল্লাচিল্লা, উচ্চ শব্দে গান বা মানুষের অতিরিক্ত যাতায়াত থাকে, তবে কবুতর ব্রিডিংয়ের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পায় না।
সমাধান: কবুতরের লফট বা খাঁচা এমন একটি নিরিবিলি জায়গায় রাখুন যেখানে শিকারী প্রাণীর ভয় থাকবে না এবং মানুষের যাতায়াত কম হবে। খাঁচার অবস্থান ঘন ঘন পরিবর্তন করা থেকে বিরত থাকুন।
৪. অনুপযুক্ত খাঁচা বা ডিম পাড়ার জায়গার অভাব (Inadequate Nesting Place)
অনেক সময় সবকিছু ঠিক থাকার পরও শুধুমাত্র খাঁচার ভেতরের পরিবেশ এবং ডিম পাড়ার সঠিক পাত্র বা উপাদানের অভাবে মাদি কবুতর ডিম আটকে রাখে।
ছোট সাইজের খাঁচা: খাঁচার সাইজ ছোট হলে কবুতর ঠিকমতো ক্রস (Mating) করার পর্যাপ্ত জায়গা পায় না। সফলভাবে মেটিং না হলে ডিম আসবে না। কবুতরের জন্য অন্তত ২৪x২৪ ইঞ্চি সাইজের খাঁচা প্রয়োজন।
নেস্টিং বাটি বা ডিমের পাত্রের অভাব: কবুতরের খাঁচায় যদি ডিম পাড়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট পাত্র বা বাটি (Nest Bowl) না দেওয়া হয়, তবে মাদি কবুতর নিরাপদ বোধ করে না।
নেস্টিং ম্যাটেরিয়াল বা খড়কুটো না দেওয়া: কবুতরের একটি প্রাকৃতিক স্বভাব হলো ডিম পাড়ার আগে তারা বাসা গোছায়। খাঁচায় যদি শুকনো ঘাস, নারিকেলের ছোবড়া বা খড় না দেওয়া হয়, তবে তাদের ডিম পাড়ার হরমোন পুরোপুরি উদ্দীপিত হয় না।
সমাধান: খাঁচায় অবশ্যই একটি প্লাস্টিক বা মাটির ডিমের পাত্র দিন। পাত্রের ভেতরে সামান্য ধানের তুষ বা শুকনো খড় বিছিয়ে দিন এবং খাঁচার কোণায় কিছু বাড়তি খড় ছিটিয়ে রাখুন, যাতে তারা নিজেরা বাসা সাজাতে পারে।
৫. ঋতু পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার প্রভাব (Seasonal Changes & Molting)
প্রকৃতি এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথে কবুতরের ডিম পাড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে কবুতরের ডিম না দেওয়াটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
মোল্টিং বা পশম ঝরা (Molting Season): প্রতি বছর সাধারণত বর্ষাকালের শেষ দিকে বা শরতের শুরুতে (ভাদ্র আশ্বিন মাসে) কবুতরের গায়ের পুরানো পশম ঝরে গিয়ে নতুন পশম গজায়। একে মোল্টিং পিরিয়ড বলা হয়। এই সময়ে কবুতরের শরীরের সমস্ত পুষ্টি ও শক্তি নতুন পালক গজাতে ব্যয় হয়। তাই মোল্টিং চলাকালীন মাদি কবুতর ডিম পাড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
অতিরিক্ত গরম বা শীত: তীব্র তাপদাহ (Heat Stress) অথবা অতিরিক্ত ঠান্ডার সময়ে কবুতরের প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে এপ্রিল – মে মাসের তীব্র গরমে কবুতরকে জোড়া না দেওয়াই ভালো, কারণ এই সময়ে ডিম দিলে কবুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ডিম নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সমাধান: মোল্টিং শুরু হলে নর ও মাদি কবুতরকে আলাদা করে দিন। এই সময়ে তাদের রেস্ট (Rest) দেওয়া উচিত। পশম ঝরা শেষ হলে এবং আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে (যেমন শীতের শুরুতে) ভালো মানের খাবার খাইয়ে আবার জোড়া দিন।
পুষ্টির অভাব এবং এর সমাধান (Nutritional Deficiency & Solutions)
কবুতর সঠিক বয়সে পৌঁছানোর পরও যদি ডিম না দেয়, তবে তার ৯০% কারণ হলো পুষ্টির অভাব। একটি ডিম তৈরি করতে মাদি কবুতরের শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ এবং বিশেষ করে ক্যালসিয়াম খরচ হয়। শরীরে এই উপাদানগুলোর ঘাটতি থাকলে কবুতরের ডিম্বাশয় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
ক) ক্যালসিয়াম ও মিনারেলের ঘাটতি (Calcium & Mineral Deficiency)
ডিমের খোসা বা ওপরের শক্ত আবরণটি পুরোপুরি ক্যালসিয়াম দিয়ে তৈরি। মাদি কবুতরের শরীরে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম না থাকলে তার মস্তিষ্ক ডিম তৈরির সংকেত দেয় না। অনেক সময় ক্যালসিয়ামের তীব্র অভাবে কবুতর প্যারালাইজড বা ল্যাংড়া হয়ে পড়ে, যাকে খামারিরা “ডিম আটকে যাওয়া” বা “ডিম পাড়ার পর অবশ হওয়া” বলেন।
গ্রিটের গুরুত্ব: খাঁচায় বন্দি কবুতর প্রাকৃতিকভাবে মাটি বা ইটের কণা খেতে পারে না। তাই এদের লফটে সবসময় মিনারেল গ্রিট (Mineral Grit) বা ডিমের খোসা চূর্ণ, ঝিনুক চূর্ণ, পোড়া মাটি ও কয়লার মিশ্রণ একটি ছোট পাত্রে স্থায়ীভাবে রেখে দিতে হবে। গ্রিট না খাওয়ালে কবুতরের হজমশক্তি কমে যায় এবং ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণ হয় না।
খ) ভিটামিন ও প্রোটিনের অভাব (Vitamin & Protein Deficiency)
শুধুমাত্র ধান, গম বা ভুট্টা খাওয়ালে কবুতর বেঁচে থাকে ঠিকই, কিন্তু প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ, ডি৩, এবং ই (Vitamin A, D3, E) পায় না।
ভিটামিন ই এবং সেলেনিয়াম সরাসরি কবুতরের ফার্টিলিটি বা ডিম উৎপাদনের হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। খাবারের তালিকায় প্রোটিন বা আমিষের অভাব থাকলেও মাদি কবুতর ডিম পাড়ার শক্তি পায় না।
কবুতরের সুষম ব্রিডিং খাবার ও পুষ্টির তালিকা
নিচে একটি আদর্শ ব্রিডিং মিক্সড খাবারের তালিকা দেওয়া হলো, যা মাদি কবুতরের ডিম্বাশয় দ্রুত সক্রিয় করতে সাহায্য করবে:
| খাবারের নাম (Grain Type) | শতকরা হার (Percentage) | পুষ্টি উপাদান (Nutrient) | কেন জরুরি? (Benefit) |
| রেজা বা কুসুম ফুল বীজ | ২০% | ফ্যাট ও ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড | ডিম্বাণুর সঠিক গঠন ও হরমোন বৃদ্ধি করে। |
| ছোলা বা ছোট ডাল (মটর) | ২৫% | উচ্চ প্রোটিন (Protein) | ডিম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি যোগায়। |
| ভুট্টা ভাঙা বা গম | ৩০% | কার্বোহাইড্রেট (Carbohydrate) | কবুতরের শরীরের সঠিক ওজন বজায় রাখে। |
| তিল বা তিসি বীজ | ১০% | ভিটামিন ই ও অয়েল | প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি দ্রুত বাড়ায়। |
| মিনারেল গ্রিট (Grit) | আলাদা পাত্রে (১০০%) | ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন | ডিমের শক্ত খোসা তৈরি ও হজমশক্তি বাড়ায়। |
গুরুত্বপূর্ণ: এই টেবিল কোনো নির্দিষ্ট কবুতরের জন্য সম্পূর্ণ খাদ্যতালিকা বা চিকিৎসা প্রেসক্রিপশন নয়। খাবারের পরিমাণ জাত, বয়স, ওজন, কাজের মাত্রা ও প্রজনন অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
Expert Breeder’s Advice
“নতুন খামারিরা কবুতর ডিম দিচ্ছে না দেখলেই বাজার থেকে ভিটামিন কিনে অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়ানো শুরু করেন। এটি মারাত্মক ভুল। অতিরিক্ত মেডিসিন কবুতরের লিভার ও কিডনি নষ্ট করে দেয়। ডিমের সমস্যা দূর করার প্রথম শর্ত হলো কবুতরকে প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা রোদে রাখা (যাতে প্রাকৃতিক ভিটামিন ডি৩ পায়) এবং সুষম খাবার নিশ্চিত করা।”
– মুক্তাদিরুল ইসলাম, সিনিয়র পিজিয়ন ব্রিডার ও ওনার, বিডি পিজিয়ন লাভার।
ন্যাচারাল উপায়ে কবুতরের ডিম পাড়ার ক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল
প্রাকৃতিক উপায় বলতে কোনো ম্যাজিক খাবার বোঝায় না। বরং কবুতরের স্বাভাবিক প্রজনন পরিবেশ তৈরি করাই মূল লক্ষ্য।
- সুষম খাবার দিন
- পরিষ্কার পানি সবসময় রাখুন
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন
- নিরাপদ nesting area তৈরি করুন
- অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতা কমান
- জোড়াকে পর্যবেক্ষণ করুন
যদি প্রাকৃতিক খাবার এবং সঠিক পরিবেশ দেওয়ার পরও কবুতর ডিম না পাড়ে, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি ক্রনিক বা দীর্ঘদিনের। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু নিরাপদ সাপ্লিমেন্ট বা ঔষধ কোর্স করানো যেতে পারে।
প্রয়োজনীয় ঔষধ ও সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের সঠিক নিয়ম
১. ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট (CalPlex Vet / Cal D Mag):
- ব্যবহার: মাদি কবুতরের হাড়ের ও ডিমের খোসার ঘাটতি পূরণের জন্য এটি সেরা।
- ডোজ: ১ লিটার পানিতে ২ মিলি ক্যালপ্লেক্স ভেট লিকুইড মিশিয়ে পরপর ৫ থেকে ৭ দিন খাওয়াতে হবে।
২. ভিটামিন ই সেলেনিয়াম (E Sel Vet / ESB3):
- ব্যবহার: এটি নর ও মাদি উভয় কবুতরের প্রজনন হরমোনকে উদ্দীপিত করে এবং দ্রুত ডিম পাড়তে সাহায্য করে।
- ডোজ: ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম পাউডার মিশিয়ে মাসে ৫ দিন ব্রিডিং পেয়ারকে খাওয়াতে হবে।
৩. লিভার টনিক (Livavit Vet):
- ব্যবহার: যেকোনো কড়া ঔষধ বা অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স করানোর পর কবুতরের লিভার ভালো রাখতে এবং রুচি বাড়াতে এটি দেওয়া জরুরি।
সতর্কতা: এই আর্টিকেলে উল্লেখিত ঔষধের নাম ও ডোজগুলো সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। কবুতরের জাত, ওজন ও সমস্যার তীব্রতা অনুযায়ী ঔষধ ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: জোড়া দেওয়ার কতদিন পর কবুতর ডিম দেয়?
উত্তর: একটি সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক এবং পুষ্টিসম্পন্ন কবুতর জোড়া সফলভাবে গ্রহণ করার পর সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রথম ডিমটি দিয়ে থাকে।
প্রশ্ন: কবুতর একটা ডিম পেড়ে আর ডিম দিচ্ছে না কেন?
উত্তর: এর মূল কারণ হলো মাদি কবুতরের শরীরে তীব্র ক্যালসিয়ামের ঘাটতি। প্রথম ডিমটির খোসা তৈরিতে শরীরের সব ক্যালসিয়াম শেষ হয়ে গেলে দ্বিতীয় ডিমটি তৈরি হতে পারে না। একে ‘Single Egg Syndrome’ বলে। এর সমাধানে গ্রিট ও ক্যালসিয়াম কোর্স করাতে হবে।
প্রশ্ন: কবুতরের ডিম না দেওয়ার জন্য কি নর কবুতর দায়ী হতে পারে?
উত্তর: নর কবুতর যদি বন্ধ্যা (Sterile) হয় বা ঠিকমতো মেটিং না করে, তবে ডিম আসতে দেরি হতে পারে বা ডিম দিলেও তা জমে না (Unfertilized)।
শেষ কথা (Final Words)
কবুতর ডিম না দেওয়ার সমস্যাটি কোনো স্থায়ী রোগ নয়। সঠিক বয়স নিশ্চিত করে, খাঁচার পরিবেশ শান্ত রেখে এবং খাবারের তালিকায় ক্যালসিয়াম ও গ্রিটের সঠিক ব্যবহার করলে ৯০% কবুতর আবার নিয়মিত ডিম দেওয়া শুরু করে।
অতিরিক্ত মেডিসিন ব্যবহারের চেয়ে প্রাকৃতিক যত্ন ও নিরিবিলি পরিবেশের ওপর বেশি জোর দিন।
আপনার লফটের কোনো নির্দিষ্ট জোড়া নিয়ে কি আপনি এখনো চিন্তিত? নিচে কমেন্ট করে বা আমাদের জানান, আপনার কবুতরের জাত কী এবং তারা কতদিন ধরে ডিম দিচ্ছে না।
